অনলাইনে কয়দিন পরপরই জোয়ার-ভাটার মতো ইস্যু আসে, আবার ক্ষণিক বাদেই চলে যায়। প্রতিটি ইস্যুতে আলিম-জাহিল সবাই কথা বলতে উন্মুখ হয়ে ওঠে। জানুক বা না জানুক, বুঝুক বা না বুঝুক⎯সবাইকে কথা বলতেই হবে, ব্যাপারটি এমন হয়ে দাঁড়ায়।
এমনকি একপর্যায়ে তা মাসলাকি দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। তখন হক-বাতিলের বিষয়টি চাপা পড়ে মুখ্য হয়ে ওঠে দলীয় কোন্দল আর অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। ভক্তরাও সমান তালে বিপরীত পক্ষকে ধুয়ে দিতে থাকে। ইখতিলাফের আদব-কায়দা সব ভুলে গিয়ে একদল অপরদলকে তাকফির (কাফির সাব্যস্তকরণ) ও তাজলিল (পথভ্রষ্ট সাব্যস্তকরণ) শুরু করে।
সর্বশেষ ইখতিলাফ (মতবিরোধ) থেকে বিষয়টি খিলাফ (মনোবিরোধ)-এ রূপান্তরিত হয়। আর এভাবেই সাধারণ মানুষ এসব ইস্যুতে তর্ক-বিতর্কের উত্তাপ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারে না।
বর্তমান সময়ে যতই সত্য কথা বলা হোক, যতই দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করা হোক, যতই অনুসরণীয় সালাফের মানহাজ পেশ করা হোক, দিনশেষে নিজ মাসলাকের বাইরে গিয়ে সুস্পষ্ট সত্যটা গ্রহণ করার মতো চিন্তাভাবনা ও সাহসিকতা খুব কম মানুষেরই থাকে।
অনেকে আছে, যারা হয়তো না বুঝে কিংবা অন্য কারও অন্ধ অনুসরণের কারণে সত্যটা দেখতে পায় না কিংবা সঠিক বাস্তবতা বুঝতে পারে না। এসব লোকের জন্য না-হয় এক প্রকারের ওজর আছে বলে মানা যায়।
কিন্তু যারা সত্যকে সূর্যের মতো পরিষ্কার দেখতে পাওয়ার পরও তা গ্রহণ করতে চায় না শুধু এ কারণে যে, তা তার মাসলাকের বিপরীত কিংবা এতে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে বা তাকে সমালোচনার শিকার হতে হবে, তাদের জন্য কি আল্লাহ তাআলার কাছে বলার মতো কোনো ওজর আছে?
নিশ্চয় চিন্তাশীলদের জন্য এতে রয়েছে উত্তম উপদেশ।এজন্য আমি সত্যানুসন্ধানী ভাইদেরকে সবসময় একটা কথা বলি, প্রচুর অধ্যয়ন করুন। বলার চেয়ে পড়ুন বেশি। সব মানুষকে হিদায়াত করা আপনার দায়িত্ব নয়। প্রথমে নিজের জন্য হিদায়াতের খোঁজ করুন।
দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে জানার চেষ্টা করুন। এতে আলিমদের তেমন কোনো মতানৈক্য পাবেন না। এরপর নির্ভরযোগ্য কোনো সিরাত ভালোভাবে বুঝে বুঝে পড়ুন। সিরাতের শিক্ষাগুলো বর্তমান সময়ে কতটুকু আছে আর কতটুকু হারিয়ে গেছে, তা যাচাই করুন।
এরপর কুরআনের সহজবোধ্য কোনো তাফসির পাঠ করুন। সম্ভব হলে আরবিটাও শিখে নেওয়ার চেষ্টা করুন। রাব্বানি আলিমদের খুঁজে বের করুন, যারা সত্যকে কখনো লুকায় না এবং এ ব্যাপারে মানুষের সমালোচনার ভয় করে না। এঁদের সংখ্যা অনেক কম, তাই খুঁজে পেলে এটাকে গনিমত হিসেবে গ্রহণ করুন এবং তাঁদের সোহবত নেওয়ার চেষ্টা করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলিমদের মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে নিজেকে জড়াবেন না। তাঁদের ব্যাপারে কটুবাক্য ও অমর্যাদাকর আচরণ থেকে পুরোপুরি বিরত থাকবেন। নিজের বিপক্ষে গেলেও ভিন্ন মতাবলম্বী আলিমদের ব্যাপারে অশালীন আচরণ না ভদ্রতার পরিচায়ক, আর না তা ইসলামের শিক্ষা। মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়টি যদি অপ্রয়োজনীয় হয় তাহলে সেটাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করুন।
আর তা ইসলামের মৌলিক কোনো আকিদা বা বিধানের সাথে সম্পর্কিত হলে সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে সবার কথা শুনুন। বিশেষত রাব্বানি আলিমদের মতগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাঁদের দলিলগুলো মনোযোগ সহকারে দেখুন। হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।
সর্বশেষ ইলম ও তাকওয়ার মাপকাঠিতে যে আলিমকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মনে হয়, তাঁর মত গ্রহণ করে নীরব হয়ে যান। এর চেয়ে বেশি করতে গেলেই ঘটবে নানা বিপত্তি।
কথা আরও অনেক আঙ্গিকে বলার সুযোগ ছিল। করণীয় বিষয়ে আরও দিক-নির্দেশনার দরকার ছিল। কিন্তু ফিতনার এ যুগে সাধারণ মুসলিমদের জন্য আপাতত এতটুকু্ই যথেষ্ট। মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়াদিতে এভাবে চলাই সার্বিক দিক বিবেচনায় নিরাপদ। সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে, আপনাকে কোনো দল যেন নিজেদের মাসলাকি স্বার্থে ও অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যবহার করতে না পারে, যার ফলে কিয়ামত দিবসে আপনি আল্লাহ তাআলার আদালতে ফেঁসে যাবেন।
যত বড় আল্লামা আর বুজুর্গই হোক না কেন, একটা কথা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে, এরা কেউই ফেরেশতা বা মাসুম (নিষ্পাপ) নয়। যে-কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে কিংবা বাতিলের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারে অথবা ভয়ে বা লোভে ফতোয়া পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। তাই সদা সতর্ক থাকা জরুরি। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সরল পথের দিশা দিয়ে সে পথের ওপর আমৃত্যু অবিচল রাখুন, আমীন।
