মানুষ কি সকল মানবিক দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে?

মানুষ কি সকল মানবিক দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে?


কাজী নজরুল ইসলামের বিবাহটা ছিলো আধুনিক ভারতবর্ষের প্রথম হিন্দু-মুসলিম বিবাহ ৷ আলেমগণের মতে মুসলমানরা আহলে কিতাবদের বিবাহ করতে পারলেও, মুশরিকদের ধর্মান্তরিত করা ব্যতিত বিবাহ করতে পারবে না (বর্তমানে আহলে কিতাবদের বিবাহের বিষয়েও আলেমগণ নিষেধ করে থাকেন) ৷

সে সময়ে লিভটুগেদার প্রথা চালু ছিলো না বিধায় এক সাথে থাকার জন্য কোন না কোন ধর্মের রেওয়াজ অনুসরণ করে বিবাহ করতে হতো ৷ কবিকেও হয় হিন্দু রীতি না হয় মুসলমানদের রীতি অনুসরণ করে বিবাহ রেজিষ্ট্রি করতে হতো ৷ যেহেতু কবিও ধর্মান্তরিত হতে পারছেন না, অন্যদিকে প্রমীলাকেও তিনি ধর্ম পরিবর্ত করাতে চান না, সেহেতু তাদের বিবাহটা ছিলো একটা জটিল প্রক্রিয়া ৷ 

১৮৭২ সালে বৃটিশ সরকার একটি আইন করে ৷ কেউ যদি ধর্মীয় রীতি ব্যতীত বিবাহ রেজিষ্ট্রি করতে চায় করতে পারবে ৷ তবে বিবাহ রেজিষ্ট্রি করার সময় বর-কনেকে ঘোষণা দিতে হবে যে, তারা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, পার্সীয়ান, জৈন সহ কোন ধর্মের অনুসারী নয় ৷ সোজা ভাষায় নাস্তিক ৷ কবির কিন্তু সেক্ষেত্রেও বাঁধা ছিলো ৷ কারণ এক্ষেত্রে কনের বয়স আঠার হতে হতো, প্রমীলার বয়স তখন ষোলো ৷

অবশেষে মোগল সম্রাটদের অনুসারিত নিয়মানুসারে অর্থাৎ কবি কবির ধর্ম পালন করবেন, দোলন তাঁর ধর্ম পালন করবেন; এই নীতিতে ১৯২৪ সালের ২৪ এপ্রিল কবি সম্রাটের বিয়ে হয় ৷ এই বিবাহ কতটুকু শুদ্ধ হয়েছে সে বিষয়ে সম্মানিত আলেমগণ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন ৷ প্রমীলাই কবির জীবনে প্রথম বা শেষ নারী ছিলেন না ৷ প্রমীলার পূর্বে নার্গিস এবং পরে ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে মজেছিলেন ৷

আমরা যাদের ভালোবাসি বা শ্রদ্ধা করি মনে মনে তাদের এক ধরনের কাল্পনিক আদর্শিক ছবি আঁকতে থাকি ৷ যখনই আমাদের সেই কাল্পনিক ছবির সাথে ব্যক্তির জীবনের সাথে মিলে না, তখন আমাদের হৃদয় ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় ৷ সকল শ্রদ্ধা উবে যায় ৷ এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের আগে নির্ধারিত করতে হবে আমরা ঐ ব্যক্তিকে কি কারণে ভালোবাসি বা কেনো শ্রদ্ধা করি ৷

একজন লেখক লেখার মাধ্যমে সমাজের মানুষের সুখ, দুঃখ, অসঙ্গতি তুলে ধরার পাশাপাশি মানুষকে বিনোদন প্রদান করবেন ৷ মানুষ যাতে গোমরাহ হয়ে না যায় একজন আলেম সে বিষয়ে সতর্ক করবেন এটাই স্বাভাবিক ৷ একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করবে তার প্রতি ভালোবাসা ৷ 

আমরা মনে করি যে, আমাদের প্রিয় মানুষটি সকল ধরনের মানবিক দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে ৷ যার কারণে আমাদের ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা কচু পাতার পানির মত টলমল করতে থাকে ৷ কেউ যদি লেখকের কাছে ফতোয়া তালাশ করে, আলেমের কাছে কবিতা প্রত্যাশা করে, আর খেলোয়াড়ের কাছে আদর্শ খোঁজে তাহলে অবশ্যই বিপত্তি ঘটবে ৷ 

আমরা ভুলে যাই মানুষ ফেরেশতা না ৷ কেউই ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে না ৷ কাউকে ভালোবাসতে হলে তার ভালো-মন্দ উভয়কেই ভালোবাসতে হবে ৷ কারো মন্দ বিষয়কে গ্রহণ করার ক্ষমতা না থাকলে তাকে প্রকৃত অর্থে কখনোই ভালোবাসা হয় না ৷

Read Also :

Getting Info...

Post a Comment