সুন্দরবনের মানুষ কিসের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে?

বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি মানুষকে অর্থ উপার্জন করতে হয়। আর আয় করার জন্য যে পন্থা অবলম্বন করতে হয় তা হল জীবিকা। জীবন ও জীবিকা একটা আর একটার সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। এলাকা ভেদে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। 

শহরের মানুষের জীবন ও জীবিকা যেমন এক রকম, তেমনি বন সংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা অন্যরকম। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই বনেই রয়েছে পৃথিবীর ভয়ালতম সুন্দর প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার। 

সুন্দরবনের মানুষ কিসের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে?

এছাড়াও আছে হরিণ, বানর, শুকর, কুমির, সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী। আর আছে বিভিন্ন প্রজাতির মুল্যবান বৃক্ষ। ডাঙ্গায় বাঘ, জলে কুমির প্রবাদটি সুন্দরবনের জন্য খুবই প্রযােজ্য। এই বিশাল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের চারপাশে ও ভিতরে প্রবাহিত হচ্ছে বিভিন্ন নদ নদী ও তার শাখা প্রশাখা । 

সুন্দরবন প্রাকৃতিক সম্পদের এক পরিপূর্ণ ভান্ডার। এই সম্পদ আহরণের জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলােতে মানুষ অনেক আগে থেকেই বসবাস করে আসছে। প্রকৃতির এক বৈচিত্রময় স্থান এই সুন্দরবন। এক দিকে সম্পদের প্রাচুর্য্য, অন্য দিকে আছে প্রাকৃতিক বৈরিতা। নদী ভাঙ্গন, ঘূর্ণিঝড়, জলােচ্ছাস, লবনাক্ততা, অতিবৃষ্টি এ অঞ্চলের মানুষের নিত্য সঙ্গী। 

এসব কিছু উপেক্ষা করেও তারা এগিয়ে চলে জীবিকার সন্ধানে। ধর্মে তারা বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর হলেও কর্মে তারা এক। অর্থাৎ বনজীবি। এলাকার প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি সুন্দরবন। এ অঞ্চলের ব্যাবসা বাণিজ্য সবকিছু সুন্দরবন নির্ভর। 

কিন্তু প্রকৃতির এই অফুরন্ত সম্পদও যেন দিন দিন কমে আসছে। প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মচারী, স্থানীয় দালাল চক্র, চোরাকারবারি ও ডাকাত দলের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এনে দিয়েছে। সুন্দরবন থেকে মাছ, কাঁকড়া, গােলপাতা, মােম, মধু, কাঠ সংগ্রহ করে এতদিন যারা জীবন জীবিকা নির্বাহ করত তাদের জীবনেও নেমে এসেছে ছন্দপতন। 

কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে এই এলাকার কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সব বৃক্ষ ও প্রাণী সম্পদ। যার দায় ভার এসে পড়ে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল সাধারন মানুষের উপর । 

আর এই বনাঞ্চলের সবচেয়ে বড় অসহনীয় সমস্যাটি হল ডাকাতের উৎপাত। একে তাে জীবন বাজী রেখে যেতে হয় সুন্দরবনে, তার উপর ডাকাত। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘাঁ। সুন্দরবনে যেতে হলে যেমন লাগে সরকারী পাস, তেমনি নিতে হয় ডাকাতদের পাস। না হলে জীবনে নেমে আসে সর্বনাশ। মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শুধু মাত্র ডাকাতদের ভয়ে অনেকেই পুরাতন পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। করছে মানবেতর জীবন যাপন। 

বন রক্ষায় নিয়ােজিত বিভিন্ন বাহিনী মাঝে মাঝে কিছু অভিযান পরিচালনা করলেও সফলতা খুবই কম। ফলে এ এলাকার মানুষ তাদের জীবন জীবিকা ও ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই দালাল চক্র ও ডাকাত দল বনের বাঘ, হরিণ মেরে ফেলছে এবং মূল্যবান কাঠ পাচারের ফলে সরকার সম্প্রতি বন সংরক্ষণের কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মানুষের যত্রতত্র বনে প্রবেশ নিষেধ, গাছ কাটার পাশ, গােলপাতা আহরণ বন্ধ সহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। স্থানীয় বনজীবিদের উপর এর প্রভাব পড়ছে। 

স্থানীয় বনজীবিদের দাবী সরকার-কে বন সংরক্ষণের পাশাপাশি তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের জীবন ও জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সুন্দরবনকে পর্যটন এলাকা ঘােষনা করে পর্যটনের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মাছ ও কাঁকড়া চাষ এ অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় দিক। 

তাই যে সকল প্রতিষ্ঠান ও সরকারের যে সকল বিভাগ এর উপর কাজ করে যেমন, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, কারখানা/হিমাঘর স্থাপন, কাঁকড়া মােটাতাজাকরন প্রকল্প হাতে নিতে হবে, এলাকাতে ছােট ছােট শিল্প কারখানা স্থাপন করে বিকল্প কর্মসংস্থান এর সুযােগ সৃষ্টি করতে হবে। এ এলাকার মানুষ সবসময়ই প্রাকৃতিক বিভিন্ন দূর্যোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে। 

তাদের প্রতিনিয়ত ঘূর্নিঝড়, জলচ্ছাস, নদীভাংগন, লবনাক্ততা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদির সাথে মােকাবেলা করতে হয়। এগুলােও তাদের জীবিকা ও জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। 

তাই এই ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে যথাযথ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরী। তাহলেই উন্নত হবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা।

Read Also :

Getting Info...

Post a Comment