বায়ােডাটা দেখে কি মানুষ চেনা যায়?
আমরা সবাই উত্তম জীবনসঙ্গী কামনা করি। কিন্তু এই কামনার পেছনে চেষ্টাসাধনাকরি না। আমাদের প্রথম ব্যর্থতা ও অজ্ঞতা ধরা দেয় বায়ােডাটা লেখার ক্ষেত্রে। হাস্যকর নয় বরং অবাক করার মতাে ব্যাপার হচ্ছে বিবাহে ইচ্ছুক পাত্র বা পাত্রী নিজের বায়ােডাটা পর্যন্ত সঠিকভাবে লিখতে জানেন না। যে কারণে বায়ােডাটা দেখে বুঝা যায় না, মানুষটি কেমন!
বায়ােডাটার মধ্যে নাম, ঠিকানা ও শিক্ষাগত যােগ্যতার মতাে খুব সাধারণ বিষয়ের বাইরে ব্যতিক্রমী কিছু বিষয় নিয়ে আসা দরকার। যেমন,
আমি মানুষটা কেমন?
আমার শখ কী?
আমি কেমন জীবনসঙ্গী কামনা করি?
নিজের জীবন নিয়ে আমার পরিকল্পনা কী?
উপরের প্রশ্নগুলাে নিজেকে নিজে করে উত্তর তৈরি করা উচিত।
এবার উপরের প্রশ্নগুলাে সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা যাক। হতে পারে আপনি পড়ুয়া টাইপ কিংবা লেখক গােছের, গল্প-উপন্যাস-সাহিত্য পড়তে পছন্দ করেন। হতে পারে আপনি ধার্মিক প্রকৃতির কিংবা ধর্মতত্ত্বের বিশ্লেষক। কিংবা আপনি ভালােসংগঠক। আপনার আড্ডা দিতে ভালাে লাগে। দেশ-বিদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি নিয়ে ভাবেন। হতে পারে আপনি ভাবুক টাইপ কিংবা নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতে পছন্দ করেন। আবার হতে পারে আপনি নির্দিষ্ট কোনাে খেলা পছন্দ করেন বা খেলাধুলা করেন। ইত্যাদি বিভিন্ন টাইপের লাইফ স্টাইল আপনার থাকতে পারে। তাই আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি আসলে কী? আপনি কেমন? নিশ্চয়ই আপনি সবার মতাে নন। আপনার একটা আলাদা পরিচয় আছে। অতঃপর 'About myself পয়েন্ট উল্লেখ করে নিজের ব্যাপারে সংক্ষেপে লিখুন। যাতে অপর ব্যক্তি আপনার ব্যাপারে একটা ধারণা পায়। তেমনি “My hobby কিংবা জীবনসঙ্গীর দিক থেকে আপনার ‘Expectation'- এসব পয়েন্ট উল্লেখ করে লিখুন। যাতে অপরপক্ষের জন্যে আপনাকে বাছাই করা সহজ হয়।
অনেকে হয়ত ভাবছেন, “ধুর! এতাে কিছু লেখার দরকার কী? এসব আবার মানুষ লেখে নাকি?” এমনকি পরিবারের কর্তারাও হয়ত আপনার এরূপ বায়ােডাটা লেখার ক্ষেত্রে বাঁধ সাধতে পারে। বলতে পারে, ‘আজাইরা প্যাঁচাল বাদ দে!' যদিও এগুলাে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, পাত্র বা পাত্রী দেখতে কেমন, তাদের বংশকিংবা সম্পত্তি (হ্যাঁ, বিয়ের ক্ষেত্রে এগুলাে দেখা হয়) ইত্যাদি বাইরে থেকে বুঝা যায়। এসবের সাথে সাথে ব্যক্তির মানসিকতা কেমন কিন্তু ব্যক্তিকে নিজের ভালাের জন্যেই অন্যকে জানিয়ে দেয়া উচিত। বিশেষ করে বিয়ে করার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটামানুষের সাথে হয়ত আপনার শতভাগ মিলবে না, কিন্তু তারপরও নিজ থেকে জানিয়ে দেয়া কিংবা জেনে-বুঝে ‘কবুল করাই ভালাে।
এবার অনেকেই হয়ত বলবেন, ‘এসব বিষয় নালিখে, সামনাসামনি কথা বললেই তাে হয়! হ্যাঁ, তা তাে হয়ই। তবে আফসােসের বিষয় হলাে অনেক ছেলে-মেয়ে বিয়ের আগে কীভাবে আরেকজনের সাক্ষাঙ্কার নিতে হয় তাও জানেন না! কিছু পাত্র/পাত্রী তাে নিজে সাক্ষাৎকার নিয়ে মা-বাবা, ভাই-বােন, ভাবীকে পাঠায়। বলে, 'আমার ভয় লাগে, তােমরা কথা বললা। মনে রাখা উচিত, কিছু কিছু জায়গায় ভয় নয়, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়। কারণ, বিয়েটা আপনি করছেন, আপনার মা-বাবা নয়। জীবনসঙ্গী নিয়ে আপনাকেই চলতে হবে। তাছাড়া নানা ধরনের বৈধ পন্থায় যেহেতু এ ধরনের যােগাযােগের সুযােগ আছে, সেখানে পিছপা হওয়া উচিত নয়।
আরেকটা বিষয় না বললেই নয়। অনেকেই বায়ােডাটায় মিথ্যা জন্মতারিখ দেন। যে মিথ্যাটা তারা জন্মের পর থেকেই বয়ে চলছেন। হ্যাঁ, আমাদের অনেকের ক্ষেত্রেই মা-বাবা কিংবা স্কুল শিক্ষক সার্টিফিকেটে বয়স কমিয়ে দেন। তারা এমনটি করেন এই ভেবে যে, সরকারি খাতায় চাকরির বয়স বেশি থাকবে। যদিও মিথ্যার উপর কোন কিছুই টিকে থাকে না। যতদিন আমাদের শরীরে জোর আছে আমরা পৃথিবীর কারাে উপর নির্ভরশীল থাকবাে না, একটা কিছু করে খাবােই, ইনশাআল্লাহ। যাইহােক, বায়ােডাটা যেহেতু একটা সুন্দর জীবনের শুরুর জন্যে, তাই মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাউকে আমি অনেক ছােট’ – এমনটা বুঝনাের দরকার নেই। আর সার্টিফিকেট কিংবা পরবর্তীতে নিকাহনামায় একই তথ্য রাখলেও অন্তত বায়ােডাটায় সত্যটা লিখুন।
এদিকে, কিছু ধোঁকাবাজ ছেলে-মেয়ে ও তাদের পরিবার আছে, যারা তাদের সন্তানদের ইতােপূর্বে বিয়ে হয়ে থাকলে, বর্তমানে তালাকপ্রাপ্ত হয়ে থাকলে বায়ােডাটায় তা উল্লেখ করেন না। ভাবেন, এটা লিখলে আর বিয়ে হবে না। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, অন্যকে ধোঁকা দিয়ে কখনাে ভালাে কিছু আশা করা যায় না। আপনার নিয়ত ভালাে হলে আপনার অবস্থান জেনেই ইনশাআল্লাহ আরেকটি পরিবার আপনার সন্তানকে মেনে নেবে। তাই মিথ্যার আশ্রয় নিবেন না।
আরেকটা বিষয় না বললেই নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বৈধ পথে এগুতে ভয় পান বা গড়িমসি করেন, কিন্তু অবৈধ পথে এগিয়ে যেতে দ্বিধা করেন না। যেমন-অনেক পরিবারে দেখা যায়, মুরুব্বিরা পছন্দ করে মেয়েকে আংটি পরিয়ে আসার পর থেকেই ছেলে মেয়ে মােবাইলে চুটিয়ে কথা বলা শুরু করে দেয়। যদিও তাদের মধ্যে আদৌ কোনাে বৈধ সম্পর্ক নেই। অনেকে যুক্তি দেখায়, এবার আমরা একে অপরকে বুঝে নিই। সেক্ষেত্রে বলবাে, বুঝে নেয়ার পর্বটা যেখানে সরাসরি পরিবারের সামনে প্রাথমিক পর্যায়েই করা যেতাে, সেখানে গােপনে মােবাইলে পরপুরুষ কিংবা পরনারীর সাথে কথা বলায় কী লাভ? একটা সামান্য আংটি, সম্পর্কের কোনাে ভিত্তি বা দলিল নয়। তাই পাত্র/পাত্রীর পরিষ্পরিক বােঝাপড়াটা প্রথম সাক্ষাতেই করা জরুরি। পরবর্তীতে কথা বলা কাবিনের পরেই করা উচিত।
আবার অনেক অভিভাবক সন্তানকে বলেন, “তাের এতাে পরীক্ষা করার কী আছে?যা বলার বা জিজ্ঞাস করার, তা আমরাই করবাে।' এমন কর্তারাই নিজের সন্তানদের না সাক্ষাৎকার নিতে দেন, আর না ছেলে-মেয়ে একান্তে কথা বলে নিক -তেমন পরিবেশ সৃষ্টি করে দেন। কী পরিমাণ অজ্ঞতা ও বােকামি!
যাই হােক, যেহেতু বায়ােডাটা লিখনের ব্যাপারে কথা হচ্ছে তাই আরেকটা বিষয় বলা জরুরি। এমনও হতে পারে, আপনি চান না আপনার কোনাে বিশেষ অভ্যাস বায়ােডাটায় উল্লেখ থাকুক, কেউ জেনে ফেলুক, যাতে আপনি লজ্জিত হবেন। এর অর্থ হলাে, আপনি নিজেই স্বীকৃতি দিচ্ছেন, আপনার সেই অভ্যাসটা বদভ্যাস।
এ সংক্রান্ত একটা হাদীস
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যেটা অন্যের সামনে প্রকাশিত হােক, লােকে জানুক, সেটা যখন তুমি চাও না, তখন সেটাই পাপ।' (মুসলিম, হাদীস নং- ৬৪১০)।
তাই যদি এমন কোনাে পাপবাবদঅভ্যাস থেকে থাকে, যা উল্লেখ করার মতােনয়, তবে সেটাবিয়ের আগেই পরিহার করা উচিত। যেমন, ধুমপান কিংবা মাদকসেবনের মতাে সমস্যা। উল্লেখ্য, আজকাল আধুনিক মেয়েদের কেউ কেউ অভিজাত রেস্টুরেন্টে সিসা কর্নারে নেশা করে। নিজের ভালাের জন্য, সুস্বাস্থ্যের জন্য এগুলাে ত্যাগ করুন।
সবশেষে, যারা বিয়েটাকে স্রেফ একটা সামাজিক রীতি মনে করে, তাদের কাছে জীবনের তাৎপর্য ফিকে। তবে যারা একটা সুন্দর ও পবিত্র জীবন অতিবাহিত করতে চায়, যারা জানে বিয়ে হয় জীবনকে শান্তি দিবে, সুন্দর লক্ষ্যের দিকে পৌঁছে দিবে, নয়তাে লক্ষ্যচ্যুত করবে; ভারাই বিয়ের আগে সচেতন হয়। তাদের বায়ােডাটাই তাদের প্রতিচ্ছবি...।
