আদমে সানী বা দ্বিতীয় আদম হিসেবে পরিচিত নূহ (আ:) এর দুই ছেলে হাম এবং শাম। হামের বংশধর হেমেটিক এবং শামের বংশধর সেমেটিক নামে পরিচিত। মহাপ্লাবনের পর শামের বংশধরগণের একটি দল হেমেটিক জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে আসে আরবের বাব-আল মান্দবে। পরবর্তীতে এরাই পরিচিত হয় সেমেটীয় নামে। আরব চিহ্নিত হয় সেমেটীয় গোষ্ঠীর ধাত্রী হিসেবে। এখান থেকেই সমৃদ্ধির পথে যাত্রা করা পথিকেরা উত্তরকালের ইতিহাসে ব্যবলিনীয়, অ্যাসিরীয়, ফিনিশীয় বা হিব্রু নামে পরিচিত হয়। বিশুদ্ধ সেমেটীয় চরিত্রের উৎস লুকায়িত আছে এখানকার বালুরাশির মধ্যেই।
উম্মুল বিলাদ বা দেশ সমূহের জননী নামে অভিহিত আরব ভূমি মানবজাতির সূতিকাগার, সব ধর্ম ও জাতির মূল আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত। সেমেটিক গোষ্ঠীর আজকের দুই প্রতিনিধি হলো আরব এবং ইহূদী। আকার, প্রকৃতি, মানসিকতা, সামাজিক বিন্যাস এবং ভাষা বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি বিশ্লেষণে আরবরাই রক্ষা করে চলেছে সেমেটীয় শুদ্ধতা।
সেমেটীয় ভাষার মধ্যে আরবী অনেকটা নবীন হলেও এই আরবীই সেমেটিক ভাষা চর্চার মূল সূত্র। ব্যবিলনীয়, অ্যাসিরীয়, আরামীয়, ফিনিশীয়, আমোরাইট, ক্যালডিয়ান, হিব্রু, আরবী এবং আবিসীনিয়রা পৃথক জাতি হিসেবে আত্ন প্রকাশের আগে তারা আরবে এক সময় একই জাতি হিসবে বাস করত।
আরবের ভূভাগের অধিকাংশই ছিল মরুভূমি। সীমানা জুড়ে সামান্য কিছু ভূমি ছিল বসবাসের যোগ্য। তারপরই লবণাক্ত সমূদ্র। বর্ধীত জনসংখ্যা আরব সাগরের পশ্চিম তট ধরে উপস্থিত হয় নীলনদের উর্বর উপত্যকায়। এখানে বসবাসকারী হেমেটেীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিশে হয়ে যায় মিশরীয় এবং গড়ে তোলেন মানব সভ্যতার প্রথম সোনালী সোপানগুলো।
নির্মাণ কাজে ব্যবহার করেন পাথর এবং বিশ্বকে উপহার দেন সৌরবর্ষপঞ্জি। একই সময়ে অপর একটি শাখা পূর্বতট ধরে পৌঁছায় টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস তীরে। সুমেরীয় সভ্যতার স্বর্ণযুগের মানুষদের সাথে মিশে তৈরী করে ধনুর্বান, চাকাওয়ালা গাড়ি এবং ওজন মাপ।
উত্তর আরবের মানুষদের অধিকাংশই ছিল যাযাবর। দক্ষিণ আরবের লোকেরা ছিল অলস প্রকৃতির। তবে দক্ষিণ আরবের লোকজনই প্রথম পাদ প্রদীপের আলোয় আসেন। অর্থাৎ আরবীয় হিসেবে দক্ষিণ আরবের লোকেরাই (সাবিয়ানরা) ছিলেন সমূদ্র উপকূলের ফিনিশিয় (প্রাচীন সভ্য জাতি)।
খ্রীষ্টের জন্মের আগে প্রায় ১২৫০ বছর ধরে তারা সমূদ্র পথে একচেটিয়া ব্যবসায়-বাণিজ্য চালাত। সেই সাথে তারা ইয়েমেন ও সিরিয়ার মধ্যে স্থলপথ গড়ে তুলেছিল। সেটি মক্কা ও পেট্রার মধ্য দিয়ে গিয়ে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে সিরিয়া, মিশর ও মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
উত্তর আরবেও বেশ কয়েকটি ছোট ছোট রাজ্য গড়ে উঠেছিল। এই রাজাগুলোর মধ্যে নাবাতিয়ান রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল সবার আগে। এই নাবাতিয়ানরা এভামাইটদের নিকট হতে দখল করে নিয়েছিলেন পেট্রা। এই পেট্রা (পেট্রা গ্রীক শব্দ যার অর্থ হলো পাহাড়) খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০ বছর ধরে সাবা ও ভূমধ্যসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলের মধ্যে মরু যাত্রীদের যাওয়া আসার পথে এক গুরুত্বপূর্ন শহরে পরিণত হয়। নিরেট পাথর কেটে তৈরী এই শহরটি পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ এই তিন দিক হতেই ছিল অভেদ্য। পেট্রার প্রাসাদ বিশ্বের একটি বিস্ময়।
এই আরব ভূমিতেই রোপিত ও অঙ্কুরিত হয়েছিল এমন এক মহামানবের যাঁর প্রতিষ্ঠিত মুসলিম খিলাফত সেই সময়ের সভ্য বিশ্বের বৃহৎ অংশই জয় করে নিয়েছিল। তাঁর প্রবর্তীত ইসলাম ধর্ম বিশ্বের সকল জাতি এবং গোষ্ঠীর মধ্যে পল্লবিত হয়।
এখনও যার ছত্রছায়ায় হয়েছে দেড় শতকোটিরও বেশি অনুগামী। সমসাময়িক বিশ্বের প্রতি পাঁচ জনে একজন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুগামী এবং আযানের ধ্বনি চব্বিশ ঘন্টাই বিশ্বের কোনো না কোনো অংশে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে মুসলিম সভ্যতা সমস্ত বিশ্বে অগ্রসর হচ্ছে ফালিল্লাহিল হামদ!!
