কে সেই আলী আছাদ?
একটি নাম আলী আছাদ। যে আজ আমাদের ধ্রুবতারা। তার দিকে চেয়ে আমাদের। পথ চলতে হবে। চলবে আমরা কাফেলাকে পথ দেখিয়ে। গন্তব্যস্থলে পৌছুতে হবে যেকোন মূল্যে। আলী আহাদ (ওরফে কালাে থােকা) ছিল সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক।পূর্ব বাংলা লিবারেশন ফ্রন্ট এর প্রেক্ষাপট
১৯৫৮ সনে জেনারেল আইয়ুব খান গণতন্ত্রকে হত্যা করে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ভেঙ্গে ডিয়েটর হন। ডিক্টেটর হয়েই উনি সারাদেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং দেশপ্রেমিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তন্মধ্যে মৌলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখযােগ্য। দেশে তখন নীরব নিন্দুপ অবস্থা। কারাে টু শব্দ করার উপায় নেই। এই সময়ে বিপ্লবী বীর আলী আছাদ ঢাকা গিয়ে তরুণদের সঙ্গে পরামর্শ করে চলে এলাে জামালপুরে। এই অসীম সাহসী তরুণের দল একটি বিপ্লবী দল গঠন করেন, তার নামই হলাে পূর্ব বাংলা লিবারেশন ফ্রন্ট'। আলী আছাদ তার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ঐতিহাসিক জামালপুরেই দলের গােপন সেল স্থাপন করা হয়। ধীরে ধীরে দলের সদস্য সংখ্যা বাড়তে লাগলাে।
তখন আলী আছাদ একদল তরুণকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে উচ্চতর ট্রেনিং নিতে। প্রথমে পশ্চিম বাংলা সরকার তাদেরকে প্রবেশ করতে দিয়েছিল। পরে যখন তারা কাজ শুরু করে তখন হঠাৎ করে সরকার গুপ্তচর আখ্যা দিয়ে কারাগারে আবদ্ধ করে। পরে এখান হতে আইয়ুব সরকার যে তাদের উপর গ্রেপ্তারী পরােয়ানা ও হুলিয়া জারি করেছিল তা পাঠান হয়। এই সকল কাগজপত্র দেখে পশ্চিম বাংলা সরকার তাদের জেল হতে ছেড়ে দেয়। সেখানে বলে তরুণ বিপ্লবীরা অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলােকে পূর্ব বাংলায় যে কি উৎপীড়ন শুরু হয়েছে তা জানায় এবং তাদের সপক্ষে সহানুভূতি কামনা করে।
অতঃপর তারা গারাে পাহাড়ের সীমান্ত দিয়ে প্রথমে শ্রীবন্দী থানার পাখীমাৱা গ্রামে এসে পৌছায়। সেখানে এক সদস্যের বাড়ীতে তারা আস্তানা গাড়ে। হঠাৎ করে সামরিক জান্তার গুপ্তচর বাহিনী তাদেরকে অবরােধ করতে চেষ্টা করে কিন্তু পলকে তারা চলে যেতে সমর্থ হয়। বাড়ীওয়ালা সদস্য মিঃ আশরাফ হুসেনকে পুলিশ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ময়মনসিংহ নিয়ে গেলাে। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
অনেকদিন পরে পুলিশ ময়মনসিংহের আবদুর রহমান সিদ্দিক ও আর, এম, সাইদকে গ্রেপ্তার করলাে কিন্তু কোন তথ্য না পাওয়ার দরুন শেষে নিরাপত্তা আইনে তাদের আটকিয়ে রাখে।
আলী আছাদ তখন সম্পূর্ণভাবে ক্ষেতমজুরের বেশ ধরে সারা পূর্ব বাংলা ঘুরে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রচারপত্র বিলি করে ও বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেছিল। তখন সে দিবারাত্রি কাজ করতাে। দাড়ী-গোঁফ এরূপভাবে রাখলাে যে, কেউ আর তাকে আলী আছাদ বলে চিনতে পারে নাই। আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক আইন উঠিয়ে রাজনৈতিক দল আবার পুনর্জীবিত করা হলে শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব পার্টির কাজে ময়মনসিংহ সদরে আসেন। আমরা তখন আলী আছাদের কথা তাকে জানালাম। মুজিব ভাই আলী আহাদকে প্রকাশ্যে বের হয়ে কাজ করার কথা বলে দিয়েছিল। আমরা সংবাদ বন্ধু আলী আছাদকে জানালাম কিন্তু সে আর প্রকাশ্যে বের হলাে না। সে বললাে যে, রক্তস্বাক্ষরে শপথ নিয়েছি দেশকে মুক্ত করবাে কিন্তু বেঈমানী । পারবাে না।
সে তখন ছদ্মবেশে সহানু সারা ভারতে ঘুরে ঘুরে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সাহায্য কুড়াচ্ছিল। একদিন আসাম হতে তার লেখা পত্র পেলাম । তার খোঁজে আসামে লােক পাঠালাম কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া গেল না। লােক এসে বললাে যে, সে তখন দিল্লীর পথে পাড়ি জমিয়েছে। এরপর হতে সে নিরুদ্দেশ। কথা ছিল যে ভারতে সুবিধে না করতে পারলে সে চলে যাবে সমাজতান্ত্রিক দেশ চীন অথবা রাশিয়াতে সাহায্যের জন্য। আমরা আশা করেছিলাম সে ফিরে আসবে কি সে আর ফিরে এলাে না। কোনদিন হয়তাে আর আসবে না। সে হারিয়ে গেছে। তার বীরত্ব, ত্যাগ, তিতিক্ষাই আমাদের পাথেয়। দ্রুততারার মতাে সে আমাদের চোখের সামনে জলছে তাকে অনুভব করা যায় কিন্তু ধরাছোঁয়া যায় না। দেশ স্বাধীন হয়েছে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে চলেছে কিন্তু হারিয়ে গেছে একটি সৈনিক। আমরা অক্ষ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাকে স্মরণ করবাে- সে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার জন্য। (অসমাপ্ত)
